নবাবদের মনোরঞ্জনে ‘বাইজিদের নাচঘর’ থেকে `মধুর ক্যান্টিন’

এখানে চায়ের কাপে চুমুকে চুমুকে জমে ওঠে পড়াশোনার প্রতি ক্ষোভ কিংবা প্রীতি, ল্যাবের কাজ বুঝে নেয়া, রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক, সাংগঠনিক আলাপচারিতা, যুগলদের প্রথম পরিচয় কিংবা মধুর প্রেমালাপ হয় এখানে। এটি জ্ঞান এবং দ্রোহে সমৃদ্ধ রাজনীতির সূতিকাগার। বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের কথা।

বলা হয় বাংলাদেশের রাজনীতির আঁতুড়ঘর মধুর ক্যান্টিন। তবে শুধু রাজনীতি নয়, সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রও মধুর ক্যান্টিন। চা কিংবা সিঙ্গারা খেতে খেতে এখানে রচিত হয় ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। বলা হয় এখানে না এলে যোগ্য রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। কে জানতো আদিত্য রেস্তোরাঁ একসময়ে ইতিহাসের অংশ হবে? কে জানতো একসময়ে যেটি ছিল নবাবদের মনোরঞ্জনে বাইজিদের নাচঘর; সেটি একসময় নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশের রাজনীতির অলি গলি? নবাবদের মনোরঞ্জ ও অন্যান্য কাজে একতলা ভবনটি ১৯০৪ সাল পর্যন্ত দরবার হল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মধুর ক্যান্টিনের প্রতিষ্ঠাতা আদিত্যচন্দ্র। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আদিত্যচন্দ্র এখানে ব্যবসা শুরু করেন। তৎকালীন কলাভবন ছিল বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায়। আশপাশ জুড়ে ছিল ব্রিটিশ পুলিশ ছাউনি। ব্রিটিশ সরকার ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ ছাউনি গুটিয়ে নিতে শুরু করে। সেসময় আদিত্যচন্দ্র ব্রিটিশদের থেকে ছনের দুটি ঘর কিনে নেন। একটিতে তিনি থাকতেন, আরেকটিতে বিক্রি করতেন চা সিঙ্গারা। এভাবেই শুরু আদিত্য রেস্তোরাঁর পথচলা।

১৯৩৯ সালে আদিত্যচন্দ্র মারা গেলে ব্যবসার হাল ধরেন তার ১৯ বছর বয়সি ছেলে মধুসূদন দে। ছনঘরেই ব্যবসার কাজ চালাচ্ছিলেন মধুসূদন। বর্তমান ভবনটিতে আসেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যান্টিনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে এ জায়গাটি মধুসূদন দেকে ক্যান্টিন পরিচালনার জন্যে দেওয়া হলো।

মধুসূদন দের সততা আর আন্তরিক ব্যবহারের জন্যে অল্প সময়ের মধ্যেই মধুসূদন দে থেকে হয়ে উঠলেন মধুদা। ক্যান্টিনে খাবারের আতিশয্য নেই। রয়েছে যুক্তিতর্কের ঝড়, বহু মতের মানুষের সম্মিলন। জানা যায়, মধুর ক্যান্টিনে যে বাকির খাতা ছিল, সেটির নাম ছিলনা দিয়ে উধাও’। আজকের দিনে সেটাকে কেউ ‘ফাও খাওয়া’ নামে ডাকতে পারেন। অনেকেরই হয়তো পরিশোধ করা হয়নি কাপের পর কাপ চায়ের বিল। তবে নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না মধুদার।

৪৮’র ভাষা আন্দোলন, ৪৯’র বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী যুদ্ধ, ৬০’র দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৬' ছয়দফা, ৬৯' গণঅভ্যুত্থান, ৭০' নির্বাচন, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আর সবশেষ ২৪’র জুলাই গণঅভ্যুত্থান; বাংলাদেশের এসব রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে মধুর ক্যান্টিন জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে।

১৯৭১ এর ২৫ মার্চে শুরু হওয়া পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞে বাঁচতে পারেননি মধুদাও। মধুদাকে জগন্নাথ হলে এনে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন করে খুললো মধুর ক্যান্টিন। ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া অরুণ দে বাবার ব্যবসার দায়িত্ব নিলেন। নবকুমার ইন্সটিটিউটের ছাত্র ছিলেন তিনি। স্কুলে যাবার আগে ক্যান্টিন খুলতেন। ফিরে এসে আবার বসতেন। সেইসময় থেকে এখন পর্যন্ত তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন বাবার স্মৃতিবিজড়িত মধুর ক্যান্টিন।

মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে-পরের ছাত্রনেতারা সব ধরনের পরিকল্পনা আন্দোলনের ছক এখানে বসেই করতেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিচক্ষণ যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসে এই মধুর ক্যান্টিন থেকেই। মধুর ক্যান্টিন এখনো রাজনৈতিক আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু হয়েই রয়েছে। বিভিন্ন দলের, মতের আদর্শের ছাত্ররা এখানে নিয়মিত মিলিত হন। সবসময়ই ছাত্র আন্দোলনের ঘাঁটি এই মধুর ক্যান্টিন। যদিও ষাট-সত্তরের দশকে মধুর ক্যান্টিনের সেই আবেদন নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিভিন্ন ক্যান্টিন গড়ে ওঠার কারণে মধুর ক্যান্টিনের সেই মোহটাও নেই আর। তারপরও আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো আছে সেই মধুর ক্যান্টিন।

আপনিও ঘুরে আসতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন সংলগ্ন মধুর ক্যান্টিন থেকে। আপনারও মনে পড়ে যেতে পারে ইতিহাসের নানা অলিগলি। অভিযোগ আছে, মধুর ক্যান্টিনে বর্তমানে খাবারের মানের তুলনায় দাম অনেক বেশি রাখা হচ্ছে। এর সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেয়া হোক ঢাবিয়ানদের ওপরই।

Comments