এম মাহফুজুর রহমান:
অন্যদিকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে সাংহাই। চীন তথা বিশ্বের অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক, গবেষণা, ম্যানুফ্যাকচারিং ও প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র। এই গ্রহের সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে চলা শহর এটি। আন্তর্জাতিক শিপিং-এর কেন্দ্র এই শহর। সাংহাই বন্দর বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত কনটেইনার বন্দরও বটে।
হংজু বে ব্রিজ। চীনের একটি ট্রান্স-ওসিয়ানিক সড়ক ব্রিজ। আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের একটি মাস্টারপিস। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর এবং দীর্ঘতম সেতুগুলোর মধ্যে তৃতীয় এটি। যুক্তরাষ্ট্রের লেক পনচারট্রেইন ব্রিজ এবং চীনের জিয়াজু বে ব্রিজের পরই এর অবস্থান। এই হাইওয়ে ব্রিজটি ৩৫.৭ কিলোমিটার (২২.২ মাইল) দীর্ঘ। চীনের পূর্বোপকূলীয় এলাকায় হংজু উপসাগরে তৈরি হয় ব্রিজটি। সাংহাই, ঝাইজিং, নিংবো এবং ঝেজিয়াং মিউনিসিপ্যালিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে এটি।
ব্রিজটি সাংহাই এবং নিংবো’র দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে করেছে ১৮০ কিলোমিটারে। আর সময় কমিয়েছে অর্ধেকেরও বেশি। অর্থাৎ ৪ ঘণ্টার দূরত্বকে আনা হয়েছে ২ ঘণ্টারও কমে। হংজু বে ব্রিজ বিশ্বের ১০টি বৃহত্তম মহাসাগরয়ী ব্রিজের মধ্যে একটি। কিন্তু উত্তাল ও ভয়ঙ্কর উপসাগরে একটি ব্রিজ নির্মাণ কতটা সহজ ছিল চীনাদের জন্য?
৬ লেনের ব্রিজ হংজু বে। সেমি ফ্যানের (semi-fan) সঙ্গে ক্যাবল-স্টেড (cable-stayed) কাঠামোতে ব্রিজটি নির্মাণে মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর সময় পেয়েছিলেন নির্মাতারা। ভয়ঙ্কর স্রোত, ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটার বেগে চলা বাতাস এবং সিলভার ড্রাগনের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল তাদের। ফলে ব্রিজটি নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ এটি কোনো সাধারণ নদীর ওপর দিয়ে নয় বরং নির্মাণ করা হয়েছিলো সমুদ্রের বুকে! দানবীয় এই ব্রিজ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিলো দানবীয় সব যন্ত্রপাতি। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ব্রিজটি নির্মাণের জায়গার সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। তাই এই ব্রিজটিকে ‘ম্যান মেড মারভেল’ বলা হয়। চায়না রেইলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড এই ব্রিজটি নির্মাণ করে। আনন্দের বিষয় হলো চীনের এই কোম্পানিটিই নির্মাণ করছে আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
হংজু বে ব্রিজ প্রজেক্টের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওয়েং রেঙ্গুই বলেন, প্রথম যখন আমাকে ব্রিজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো তখন আমি প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু যখন স্পটে গিয়েছিলাম তখন বুঝেছিলাম কল্পনার চেয়েও ব্রিজ নির্মাণের বাস্তবতাটা কতটা ভয়ঙ্কর। মাউনসেল এইসিওএম-এর হেড অব ডিভিশন ড. রবিন শ্যাম ও গ্লোবাল প্ল্যানার ও ডিজাইনার এআরইউপি-এর ডিরেক্টর নাঈম হোসেন ব্রিজ নির্মাণের ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে খ্যাতিমান।
তারা বলেন, এই জায়গাটা ব্রিজ নির্মাণের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল জায়গার একটি। সমুদ্রের এপার থেকে ওপারে এইরকম ব্রিজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয় যে মানুষ কিভাবে সভ্যতার প্রয়োজনে প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। নোনা জল, সমুদ্রের তীব্র স্রোত আর ঝোড়ো হাওয়া কোনোটাই কনক্রিট ও স্টিলের সঙ্গে ভালো করে খাপ খায় না। আরেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার এলভি ঝোংডা বলেন, আমরা যত প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে জানছিলাম ততই বুঝতে পারছিলাম ব্রিজটি বানানো কতটা কঠিন হবে।
নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার আগেই এক সাংঘাতিক শক্তি সব পরিকল্পনা ওলট-পালট করে দেয়। হংজু উপসাগরে সৃষ্টি হয় কিয়াংটাং রিভার টাইডাল বোর বা কিয়াংটাং রিভার জলোচ্ছ্বাস। বিশালকার দৈত্যের মতো জলের প্রাচীর তৈরি হয় যখন তীব্র স্রোতের প্রচ- উঁচু ঢেউ উপসাগর থেকে নদীর মোহনার সরু মুখের দিকে ছুটে আসে। উপসাগর থেকে আসা এই ঢেউয়ের শক্তি এতোই বেশি থাকে যে নদীর পানিকে উল্টো পথে বইতে বাধ্য করে। আর বিরাটাকার ঢেউ সৃষ্টি করে মোহনার বিশাল এলাকা জুড়ে।
হংজু বে টাইডাল বোর পরিচিত সিলভার ড্রাগন নামে। প্রতি বছর অষ্টম চন্দ্র মাসের মাঝামাঝি এই ঢেউ জেগে ওঠে। এর গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। ৯ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হয় ঢেউ। তাই এই বান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সুন্দরও।
হাজার হাজার পর্যটক এই বান দেখতে ভীর করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রাকৃতিক বিস্ময় সম্পর্কে আগে থেকে কিছুই জানা যায় না। দারুণ অথচ বিপজ্জনক! সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে এই ভয়ংকর ড্রাগন অন্তত ১০০ জনের প্রাণ নিয়েছে।
কিন্তু তারপরও ব্রিজ নির্মাণে নিয়োজিত গবেষকদের প্রশ্ন- এখানে ব্রিজ হলে ড্রাগন রক্ষা পাবেতো? যেখান থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি ইউয়ান আয় হয়! তাদের আশঙ্কা, ব্রিজ হলে উপসাগরের জলের স্রোত বদলে যেতে পারে। তখন এই পর্যটন আকর্ষণটাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিপুল পরিমাণ অর্থ হারানোর ভয়। তাই ডিজাইনারদের কাজ শুরুর আগে এটাই প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। কিভাবে পানির স্রোত ঠিক রেখে এবং ড্রাগন পর্যটন ধরে রেখেই ব্রিজটি নির্মাণ করা যায়!
এজন্য ডিজাইন করার আগেই হাইড্রোলোজিস্টদের দেখে নিতে হয়েছিলো লড়াইটা আসলে কিসের সঙ্গে। তারা নদীর প্রবাহ এবং উপসাগরের স্রোত নিয়ে বিস্তর গবেষণা করলেন। তারপরই দাঁড় করালেন ব্রিজের সম্ভব্য মডেল।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা বের করলেন ঠিক কোন জায়গায় ব্রিজটা নির্মাণ করলে তার প্রভাব জল স্রোতের ওপর সবচেয়ে কম পড়বে। ফলে ব্রিজটা তৈরি হচ্ছিলো স্রোতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে! বিশাল এস আকৃতি দিয়ে এই ব্রিজের মডেল দাঁড় করানো হলো। এই এস শেপের ফলে বার্ষিক সিলভার ড্রাগনের ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে না।
নাঈম বলছেন, এস আকৃতির একটা জীবনদায়ী সুবিধাও আছে। যদি ব্রিজটা সরলরেখাকৃতিতে বানানো হতো তাহলে সব চালকরাই তাদের চোখের সামনে একটা কালো সুরঙ্গ দেখতে পেতেন। সেটা একঘেঁয়ে হতো। হতো বিপজ্জনকও। বিরক্ত হতেন চালকরা। ১০ বছর ধরে পরিকল্পনার পর এবং ৫০টিরও বেশি আলাদা আলাদা পরিবেশগত সমীক্ষার পরই নকশা চূড়ান্ত হয়েছিলো।
বিভিন্ন পর্যায়ের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির পর ব্রিজের সর্বশেষ পরিকল্পনার অনুমোদন দেয়া হয় ২০০৩ সালে। ব্রিজের মূল কাঠামো নির্মাণ করা হয় কিয়াংটাং ও ইয়াংজি নদী ও হংজু উপসাগরের একাংশের মধ্যে দিয়ে। এসব জায়গায় রয়েছে প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ। রয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র স্রোতের সম্ভাবনা। হংজু উপসাগরের ঢেউ ২৫ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় দেখলেও আপনার অবাক হবার কিছু থাকবে না। শক্তিশালী ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটি। এছাড়াও টাইফুন সিজনে রয়েছে প্রাণনাশী ঝড়ো হাওয়ার ভয়।
পাটাতন শক্ত করতে চীনের অধিকাংশ ব্রিজ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে কনক্রিট পাইল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় রেখে হংজু বে ব্রিজে ব্যবহার করা হয়েছে স্টিল পাইল। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে নির্মাণে অংশগ্রহণকারীদের তাই নতুন নতুন সব প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হয়েছে। দুই হাজার ২০০ ও তিন হাজার টন ওজনের দুটি বিশালকার ক্রেন ব্যবহৃত হয়েছে এর নির্মাণ কাজে।
ব্রিজটি নির্মাণে চীনকে বহুমূখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রায় ৬০০ এক্সপার্ট এক দশক ধরে ব্রিজটির ডিজাইনে কাজ করেছেন। প্রথম দিকের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে ছিলো সমুদ্রতীর হইতে দূরবর্তী কোনো স্থানে নির্মাণ কাজ শুরু করা এবং সেখান থেকে অকুস্থলে এসব ভারি জিনিসপত্র বহন। দ্বিতীয়টি ছিলো প্রতিকূল আবহাওয়া। ডিজাইনার ও ইঞ্জিনিয়ারদের তৃতীয় যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিলো তা হলো ব্রিজের অবস্থানের নীচে প্রায় ৫০ মিটার ভূগর্ভস্থ বিষাক্ত মিথেন গ্যাস অঞ্চলের আবিষ্কার। এই বিষয়টিও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে কর্মকর্তাদের। নির্মাণের কাজ আরম্ভ হওয়ার আগেই খোঁজ মেলে এই বিস্ফোরক গ্যাস স্তরের। যা ব্রিজের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছিলো। সমীক্ষায় দেখা গেছে, সমুদ্রতলে বিশাল ওই প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার রয়েছে।
জমে থাকা ওই গ্যাসের মধ্য দিয়ে ব্রিজের পাইল প্রবেশ করালে সেটা ব্রিজের স্থায়িত্বের জন্য মারাত্মক আঘাত বয়ে আনতে পারতো। তাই ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রকৌশলীরা। বিশেষ পাইপ ব্যবহার করে মাটির স্তর ফুটো করে সেখান থেকে আলাদা পথে গ্যাস বেরিয়ে যেতে দেয়া হলো। এভাবেই সব বাঁধা পেরিয়ে ব্রিজটি দাঁড়িয়ে যেতে লাগলো। ব্রিজটি যখন মাথা তুলতে লাগলো তখন আরেকটি প্রলয়ের মুখোমুখি হতে হলো। টাইফুন!
নির্মাণকালে হংজু বে ট্রান্স-ওসিয়ানিক ব্রিজ কন্সট্রাকশন কমান্ড পোস্ট পরিচালক ওয়াং ইয়ং জানান, সবচেয়ে জটিল মহাসগারীয় পরিবেশে ব্রিজটি নির্মাণ হচ্ছে যেখানে পৃথিবীর তিনটি বৃহত্তম জোয়ার বা পানি প্রবাহ রয়েছে। এখানে প্রতিনিয়ত রয়েছে টাইফুনের ভয়। আছে সমুদ্রের মাটির কঠিন স্তুরগুলো পেরুনোর মতো চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এসব বাঁধা জয় করেই সামনে এগিয়েছেন চীনা ইঞ্জিনিয়াররা।
ব্রিজের ঠিক মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে একটি সার্ভিস সেন্টার। নাম দেয়া হয়েছে ‘ল্যান্ড বিটুইন দ্য সি এন্ড দ্য স্কাই’। এর মোট আয়তন দশ হাজার বর্গমিটার। এর মধ্যে রয়েছে শপিংমল, এক্সিবিশন সেন্টার, পার্কিং এবং রেস্টুরেন্ট সুবিধা। রয়েছে একটি হোটেল এবং ৪৭৮ ফুট উঁচু একটি ‘লুকআউট’ টাওয়ারও।
এই টাওয়ারটি পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। এখান থেকেই ব্রিজ এবং সাগরের ‘বার্ডস আই ভিউ’ দেখা যায়। সার্ভিস সেন্টারটি এমন একটি দ্বীপ এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে যেখান থেকে পর্যটকরা সমূদ্রের প্রবল স্রোতের বিপদ থেকে মুক্ত।
নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০০৭ সালের ১৪ জুন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় একই বছরের ২৬ জুন। কিন্তু দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয় ২০০৮ সালের ১ মে। ব্রিজটি তৈরিতে খরচ হয়েছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ইউয়ান। ব্রিজটি ব্যবহার করতে গাড়ি প্রতি টোল ফি দিতে হবে ৮০ ইউয়ান (প্রায় এক হাজার টাকা)। ব্রিজটি হয়ে উঠেছে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রতিভূ। এভাবেই চীনারা সময়কে জয় করেছে। অসাধ্য স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। দেশকে মেলে ধরেছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার শীর্ষে। তৈরি করেছে অর্থনীতির এক শক্ত মেরুদণ্ড!
রেফারেন্স:
১. হংজু বে ব্রিজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
২. চায়না রেইলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
৩. বিভিন্ন তথ্যচিত্র।
৪. চায়না ডেইলি ওয়েবসাইট
৫. The Economic Impact of the Hangzhou Bay Bridge on CrossRegional Areas in the Yangtze River Delta: A Difference-in-Differences Approach. ডিসেম্বর-২০১৭।
লেখক: মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। ই-মেইল: mahfuzjnu21@yahoo.com.

Comments
Post a Comment